
ফটোগ্রাফির দুনিয়ায় ফিল্ম বনাম ডিজিটাল এর পর সবচেয়ে বেশি কথা বলা টপিক হচ্ছে ‘ডিএসএলআর বনাম মিররলেস’। এই বছরই দশ বছর পূর্ণ হওয়া মিররলেস ক্যামেরা টেকনোলজি বেশ আলোচিত টপিক এখন। ফটোগ্রাফিতে সিরিয়াস কিংবা সিরিয়াস হতে চাচ্ছে এমন বেশিরভাগ মানুষই বেশ দোটানায় আছেন যে কোন সিস্টেমটা ব্যবহার করবেন। ডিএসএলআর নাকি মিররলেস! আমি চেষ্টা করবো এই দুই ধরণের ক্যামেরা সিস্টেমের মধ্যকার কিছু মিল-অমিল নিয়ে কথা বলতে।
ডিএসএলআর এর পূর্ণরূপ হচ্ছে ডিজিটাল সিঙ্গেল লেন্স রিফ্লেক্স। একটা ডিএসএলআর ক্যামেরা, কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া ৩৫ মিলিমিটার এর ফিল্ম ক্যামেরার মতই ডিজাইনে বানানো। লেন্সের ভেতর দিয়ে আসা আলো ক্যামেরার ভেতরে থাকা একটা আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে প্রিজমের মধ্যে দিয়ে ভিউফাইন্ডারে দৃশ্যমান হয় আর আমরা তা দেখতে পাই। আর যখন আমরা শাটার বাটনে চাপ দেই তখন ক্যামেরার ভেতরে থাকা আয়নাটা উপরে উঠে গিয়ে আলোকে সেন্সরে পৌঁছুতে দেয় এবং সেন্সর তখন ইমেজ প্রসেসরের সাহায্যে আমাদেরকে ছবিটা তৈরি করে দেয়।
আর মিররলেস ইন্টারচেইঞ্জেবল লেন্স ক্যামেরায় আলো লেন্সের মধ্য দিয়ে সোজা ক্যামেরা সেন্সরে যায় এবং সেন্সর তখন ইলেকট্রনিক ভিউফাইন্ডারে ছবিটা কেমন হতে পারে তা দেখায় এবং শাটার বাটনে চাপ দিলে ইমেজ প্রসেসর ছবিটা তৈরি করে দেয়। আমাদের স্মার্টফোনের ক্যামেরাও মিররলেস ক্যামেরার একটা উদাহরণ। এটাতো গেল ডিএসএলআর আর মিররলেসের বেসিক পার্থক্য। দেখা যাক আর কি কি পার্থক্য আছে এই দুই ধরণের ক্যামেরার মধ্যে।

আকার এবং ওজনঃ ডিএসএলআর এ ব্যবহৃত মূল প্রযুক্তির জন্য এর মধ্যে আয়না বসানো লাগেই আর তাই এন্ট্রি লেভেল থেকে শুরু করে প্রো লেভেল পর্যন্ত সব ডিএসএলআর এর বডিই তুলনামূলকভাবে মিররলেস ক্যামেরার চেয়ে একটু বড়সড় আর ভারী হয়। প্রতিদিনের সাধারণ ব্যবহারের জন্য কেনা মিররলেস খুব সহজেই বহনযোগ্য হলেও প্রো ইউজের জন্য বিল্ড করা মিররলেস ক্যামেরার সেটআপ ওজন একই লেভেলের ডিএসএলআর এর চেয়ে খুব বেশী হালকা হয় না। কারণ প্রো লেভেলের লেন্স সবধরণের ক্যামেরার ক্ষেত্রেই বেশ ভারী হয়ে থাকে। এছাড়া, যেসব ইউজারের হাত একটু বড় তাদের জন্য মিররলেস মাঝেমধ্যে একটু সমস্যা সৃষ্টি করে। আকারে ছোট হওয়ায় মিররলেস ক্যামেরা বড় হাতের মানুষের জন্য গ্রিপ করা একটু ঝামেলাই বটে।
লেন্সঃ প্রো গ্রেড ক্যামেরার পেছনে সব টাকা খরচ না করে ভালো লেন্স কেনা উচিত। ভালো লেন্স বেশ দামী হলেও ফলাফল বেশ ভালো দিবে। ডিএসএলআর এর লেন্স লাইনআপ বেশ লম্বা। কিন্তু মিররলেস এর লেন্স লাইনআপ অতটা লম্বা না। ক্যানন-নাইকনের সব মিলিয়ে দু-তিনশর বেশি লেন্স থাকলেও সনির মত শীর্ষস্থাণীয় মিররলেস ক্যামেরা ম্যানুফ্যাকচারার কয়েকডজনের মত লেন্স অফার করছে।
যেইস(Zeiss) এর ভালো কিছু লেন্স বাজারে আছে সনি মিররলেস ক্যামেরার জন্য। প্যানাসনিক বা অলিম্পাস ‘মাইক্রো ফোর থার্ড’ টাইপের সেন্সর ব্যাবহার করে বলে এবং তারা বেশ খানিকটা সময় নিয়ে মিররলেস ইন্ডাস্ট্রিতে থাকার ফলে তাদের লেন্স লাইনআপ মিররলেস এর জন্য ভালোই বলা যায়। তাছাড়া সিগমা এবং ট্যামরন এখন মিররলেস এর জন্য ভালো কিছু লেন্স বানাচ্ছে।
আশাজাগানিয়া কথা হচ্ছে, ডিএসএলআর এর যেকোন লেন্স অ্যাডাপ্টার বা কনভার্টার এর সাহায্যে মিররলেস ক্যামেরায় ব্যবহার করা যায় কিন্তু অ্যাডাপ্টার গুলো এখনো পুরোপুরি নিখুঁত না। অ্যাডাপ্টারগুলোর অটোফোকাস তুলনামূলকভাবে বেশ ধীরগতির এবং ওজনও বাড়িয়ে দেয় গিয়ারের। অনেক অ্যাডাপ্টারে তো শুধু ম্যানুয়াল ফোকাস সাপোর্ট করে। আর অ্যাডাপ্টারগুলো খুব সস্তাও না।
ভালো রান্না করার মত ভালো ছবি তোলার কোনও রেসিপি না থাকলেও ভালো-ঝকঝকে প্রো গ্রেডের ছবি তোলার জন্য অবশ্যই ভালো লেন্সের জন্য টাকা ইনভেস্ট করা উচিত। কারণ বিশেষ ধরণের ছবি তোলার জন্য বিশেষ ধরণের লেন্স বানানো হয়েছে। এছাড়া লেন্সের অ্যাপার্চার (লেন্সের আলো প্রবেশ করার স্থান) ছবি তোলার জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং বেসিক একটা ব্যাপার। ভালো লেন্সের অ্যাপার্চার বেশি থাকে।
অ্যাপার্চার খুব কম হলে লো-লাইটে ভালো ছবি পাওয়া যাবেনা যত ভালো ক্যামেরাতেই লাগানো থাকুক না কেন। আইএসও বাড়িয়ে হয়তো ছবিকে আলোকিত করা যাবে কিন্তু ছবিতে নয়েজ অনেক বেড়ে যাবে ফলে ছবি ভালো হবেনা। আবার লেন্সের ফোকাল লেংথ ঠিক না থাকলেও প্রয়োজনমত ছবি পাওয়া যাবেনা। কারণ ৫০মিমি লেন্স দিয়ে নিশ্চয়ই কেউ ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফি করতে চাইবেনা আর করতে চাইলেও পারবেনা কারণ জঙ্গলের পশুপাখি তো আর আমাদের পোষা আদুরে পার্সিয়ান বিড়াল বা সাইবেরিয়ান হাস্কি না যে, কোলে এসে গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়বে আর আরামসে ছবি তুলে নেবো।
ভিউফাইন্ডারঃ ডিএসএলআর এবং মিররলেস ইন্টারচেইঞ্জেবল লেন্স ক্যামেরার মধ্যে একটা বড় পার্থক্য হচ্ছে ভিউফাইন্ডারে। ডিএসএলআর এ থাকে অপটিক্যাল ভিউফাইন্ডার। লেন্সের ভেতর দিয়ে আসা আলো ক্যামেরার ভেতরে থাকা একটা আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে প্রিজমের মধ্যে দিয়ে অপটিক্যাল ভিউফাইন্ডারে দৃশ্যমান হয় আর আমরা তা দেখতে পাই।
অপটিক্যাল ভিউফাইন্ডার এমনকি যখন ক্যামেরা বন্ধ থাকে তখনো সচল থাকে। লেন্স ক্যাপটা খুলে স্যুইচ অন না করে একটা ডিএসএলআর চোখের সামনে ধরে দেখুন বুঝতে পারবেন। অপটিক্যাল ভিউফাইন্ডার কোন ধরণের ডিজিটালাইজেশন ছাড়াই পিওর ফিজিক্স ব্যবহার করে সেই দৃশ্যটা দেখায় যা আমরা খালি চোখ দিয়ে দেখতাম। মনে করতে পারি যে চোখের সামনে আরেকটা চোখ।
অপটিক্যাল ভিউফাইন্ডার বা ওভিএফ এ একজন ফটোগ্রাফারকে নির্ভর করতে হয় ক্যামেরার মিটারিং মোড এবং নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ওপর। সম্পূর্ণরূপে ইলেকট্রনিক্স এর নির্ভর করলে নিজের ফটোগ্রাফি জ্ঞান সীমাবদ্ধ থেকে যাবে আর তাই ওভিএফ কম্পোজিশনের জন্য আমার সেরা পছন্দ। আমি নিজের চোখ যেমন খুব দ্রুত ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একটা শট কল্পনা করতে পারি তেমনি ওভিএফেও কোন ধরণের ল্যাগ ছাড়াই দ্রুত কম্পোজ করে একটা ছবি তুলে ফেলা সম্ভব। সবসময় অ্যাক্সেস করার সুযোগ থাকায় ক্যামেরা অন হবার পর ওভিএফ এ কোনধরনের ডিলে বা দেরী ছাড়াই শট কম্পোজ করে ছবি তোলার সুযোগ করে দেয়। স্পোর্টস বা ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে এটা বেশ বড় ধরণের সুবিধা।

মিররলেস ইন্টারচেইঞ্জেবল লেন্স ক্যামেরায় আলো লেন্সের মধ্য দিয়ে সরাসরি ইমেজ সেন্সরে যায় এবং ডিসপ্লেতে আমরা দেখতে পাই। অনেক মিররলেস ইন্টারচেইঞ্জেবল লেন্স ক্যামেরায় ইলেকট্রনিক ভিউফাইন্ডার থাকে। এই ইলেকট্রনিক ভিউফাইন্ডার হচ্ছে খুব ছোট্ট একটা ডিসপ্লে যা কোন ধরণের মিরর বা আয়নার সাহায্য ছাড়াই সেন্সরে আসা আলো ছবিতে রূপান্তরিত হয়ে আমাদেরকে একটা লাইভ ভিউ দেখায়। যাকে বলা যায় দৃশ্যের একটা লাইভ ভিডিও।
ইলেকট্রনিক ভিউফাইন্ডারের একটা সুবিধা হচ্ছে এতে অনেক বেশি ইনফরমেশন পাওয়া যায় অপটিক্যাল ভিউফাইন্ডারের তুলনায়। কারণ ইভিএফ একটা ছোট ডিসপ্লে আর তাই তাতে অনেক বেশি ইনফরমেশন এর জায়গা করে দেয়া যায় যার মধ্যে একটা হচ্ছে হিস্টোগ্রাম। হিস্টোগ্রাম দেখে খুব সহজেই ছবির জন্য ঠিকঠাক এক্সপোজার বেছে নেয়া যায়। ইভিএফ এর অনেক বড় সুবিধা হচ্ছে হোয়াইট ব্যালান্স বা শাটার স্পীড পরিবর্তন করার সাথে সাথেই ইভিএফ এ তা লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ ফাইনাল ইমেজ যেমন হবে ঠিক তেমনই ইভিএফে দেখা যায়। এটা বেশ বড় একটা সুবিধা।
কিন্তু আলো যত কমতে থাকে ইভিএফ এর কার্যকারিতাও তত কমতে থাকে। কিছুটা ল্যাগি হতে থাকে। সাবজেক্ট এর মুভমেন্ট অতটা স্মুথলি দেখায় না যতটা দেখায় ঝকঝকে আলোতে। ফলে সিঙ্গেল শটের ক্ষেত্রে সমস্যা না হলেও কন্টিনিউয়াস শ্যুটিং এ বেশ ভালো সমস্যার সৃষ্টি করে। এছাড়া আলো কমে গেলে ইভিএফে দেখানো ছবির কনট্রাস্ট বেড়ে যায় অর্থাৎ ছবির অধিকাংশটুকুই কালো হয়ে যায়।
ইভিএফ ওভিএফ এর তুলনায় একটু পিছিয়ে আছে স্টার্টআপ টাইমিং এ। ক্যামেরা অন করার পর ইভিএফে অ্যাক্সেস পেতে ১-২ সেকেন্ড বা তার ভগাংশের পরিমাণ সময় দেরী হয়। স্পোর্টস বা ওয়াইল্ডলাইফ ছবি তোলার ক্ষেত্রে যা অনেক বেশি দেরীই বলা যায়। সময়ের সাথে সাথে টেকনোলজির উন্নতি হচ্ছে এবং ইভিএফ আগের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত। কিন্তু সরাসরি চোখে পৌঁছানো আলো আর সেন্সরে ঢুকে ছবিতে কনভার্ট হয়ে চোখে পৌঁছানো আলোর মধ্যে সময়ের কিছুটা পার্থক্য থাকবেই সবসময়।
অটোফোকাসঃ স্পোর্টস কিংবা ওয়াল্ডলাইফ শ্যুটারদের জন্য অটোফোকাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার। ম্যানুয়াল ফোকাস দিয়ে তো আর ২১০ মাইল প্রতি ঘন্টায় চলা ফর্মূলা ওয়ান রেইসিং কারের শার্প ছবি তোলা সম্ভব না। কেনিয়ার মাসাই মারা ন্যাশনাল রিজার্ভে শূণ্যে কয়েক ফিট ওপরে ঘটতে থাকা চিতার থাবায় ইম্পালা শিকারের দৃশ্যও ম্যানুয়াল ফোকাস দিয়ে কক্ষনো সম্ভব না। আই রিপিট কক্ষনো না।
মিররলেস ইন্টারচেইঞ্জেবল লেন্স ক্যামেরা যখন বের হয় তখন কনট্রাস্ট ডিটেক্ট (Contrast detect AF) অটোফোকাস নামে একধরণের অটোফোকাস সিস্টেম ব্যাবহার করা হতো। যেকোনো কমপ্যাক্ট ক্যামেরা একইধরণের অটোফোকাস সিস্টেম ব্যবহার করে। এই সিস্টেমে মেইন ইমেজ সেন্সর দৃশ্যের কোন অংশে কনট্রাস্ট বা কালো-সাদার পার্থক্য বেশি তা মেপে লেন্সের ফোকাসিং রেইঞ্জ ব্যাবহার করে ফোকাস করতো এবং একই সেন্সর শেষমেষ ছবিটা তুলে ফেলতো।
সিস্টেমটা বেশ ভালই ছিলো কারণ যা দেখা যেতো তাই পাওয়া যেত। এন্ট্রি লেভেলের কমপ্যাক্ট মিররলেস ক্যামেরার লেন্স খুব ছোট এবং হালকা হওয়ায় লেন্সের ভেতরের এলিমেন্টসগুলোও বেশ হালকা হয় ফলে খুব দ্রুত ঘুরে অটোফোকাস করতে পারে। কিন্তু বর্তমান সময়ের মিররলেস ক্যামেরার জন্য ডিজাইন করা লেন্সগুলো সাধারণত বড় এবং ভারী হওয়ায় এই সিস্টেম লেন্সের এলিমেন্টগুলো দ্রুত কাজে ব্যবহার করে অটোফোকাস করতে পারে না। ফার্স্ট জেনারেশনের ডিএসএলআর এ লাইভভিউ ইউজাররা বলতে পারবে এই ব্যাপারটা কতটা বিরক্তিকর। কারণ মিররলেস এর ইলেকট্রনিক ভিউফাইন্ডার আর ডিএসএলআর এর লাইভভিউ একই কথা।

ডিএসএলআর এর অটোফোকাস সিস্টেমটা একটু অন্যরকম। যার নাম হচ্ছে ফেইজ ডিটেক্ট অটোফোকাস(Phase detect AF)। এই সিস্টেমটা কনট্রাস্ট ডিটেক্ট অটোফোকাসের এর চেয়ে বেশি দ্রুত কিন্তু সামান্য কম নিখুঁত বলা যায়। কারন এই সিস্টেমে ফোকাস করার জন্য আলাদা সেন্সর থাকে যে ফোকাস করে এবং মেইন ইমেজ সেন্সর ছবি তুলে।
যদি এই দুটি সিস্টেমকে একসাথে করে অন্য কোন নিখুঁত একটা সিস্টেম দাঁড় করানো যায় তবে কেমন হয়? ক্যামেরা ম্যানুফ্যাকচারাররাও একই কথা ভেবেছিলো। তারা একটা নতুন সিস্টেম ডেভেলপ করেছে যেখানে মেইন ইমেজ সেন্সরের পিক্সেলগুলো ব্যবহার করে কনট্রাস্ট ডিটেক্ট অটোফোকাস ঠিক রেখে তার সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে ফেইজ ডিটেক্ট করার সুবিধা। আর আদর করে এই সিস্টেমকে তারা হাইব্রিড অটোফোকাস (Hybrid AF) সিস্টেম বলে ডাকে।
হাইব্রিড অটোফোকাস সিস্টেম কনট্রাস্ট ডিটেক্ট এবং ফেইজ ডিটেক্ট দুটোকেই এফিশিয়েন্টভাবে ব্যবহার করে নিখুঁতভাবে অটোফোকাস করতে পারে। মিররলেস ক্যামেরাকে এই সিস্টেম বেশ খানিকটা পথ এগিয়ে দিয়েছে। একই প্রযুক্তি ব্যবহার করেও ডিএসএলআরও এগিয়ে গিয়েছে। কিন্তু ইলেকট্রনিক কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে মিররলেস এর অটোফোকাস এখনো ডিএসএলআর এর সমান দ্রুত হতে পারেনি। তাই বেশিরভাগ স্পোর্টস ফটোগ্রাফাররা মূলত ডিএসএলআর ছেড়ে মিররলেস এ স্যুইচ করেনি আর করে থাকলেও অতিদ্রুত নিজেদের ভুল শুধরে ফিরে এসেছে।
কন্টিনিউয়াস শ্যুটিংঃ ডিএসএলআর ক্যামেরায় একেকটা ছবি তোলার সময় মিরর বা আয়না বারবার উঠে গিয়ে সেন্সরে আলো ঢোকার সুযোগ করে দেয় ফলে কন্টিনিউয়াস শ্যুটিং এর ক্ষেত্রে প্রত্যেকটা শটের মাঝে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের (খুবই কম সময়) জন্য একটা কালো পর্দা দেখা দেয়। কিন্তু মিররলেস এ কোন মিরর বা আয়নার ঝামেলা না থাকায় মিররলেস কন্টিনিউয়াস শ্যুটিং এর পুরোটা সময় ভিউফাইন্ডারে দৃশ্যটা দেখা যায়। মিররলেস ক্যামেরায় মেকানিক্যাল শাটার এবং ইলেকট্রনিক দুটোই থাকায় খুব দ্রুত এবং নিঃশব্দে ছবি তোলা যায়।

ইমেজ কোয়ালিটিঃ একটা সময় ছিলো যখন মিররলেস প্রথম প্রথম বাজারে আসে তখন ছোট সেন্সর থাকার কারণে ডিএসএলআর চেয়ে ইমেজ কোয়ালিটির ক্ষেত্রে বেশ পিছিয়ে ছিলো। কিন্তু এখন মিররলেস ক্যামেরা ম্যানুফ্যাকচারাররা বেশ সিরিয়াস তাই প্রায় একই সাইজের সেন্সর ব্যাবহার করায় দুই ধরনের ক্যামেরাতেই একই ধরণের ভালো ছবি তোলা সম্ভব। এছাড়া সেন্সর ম্যানুফ্যাকচারাররা এখন আগের চেয়ে বেশি সেনসিটিভ আর নয়েজ সাপ্রেসিং সেন্সর বানাচ্ছে ফলে সবধরনের সেন্সরেই বেশ ভালো ছবি তোলা যায়।
ভিডিও কোয়ালিটিঃ অন চিপ ফোকাস সেন্সর থাকায় হাই-এন্ড মিররলেস ক্যামেরায় ভিডিও শ্যুট করাটা তুলনামূলকভাবে একটু বেশি সুবিধাজনক। ডিএসএলআর এ ভিডিও রেকর্ড করার সময় মিরর টা উপরে উঠে থাকে বলে সেই সময় ফেইজ ডিটেকশন করে ফোকাস করা সম্ভব হয় না। ফলে সে বাধ্য হয়ে কন্ট্রাস্ট ডিটেক্ট করে ফোকাস করে যা ধীরগতির এবং অতটা নিখুঁত না। বর্তমানে শুধু হাই-এন্ড কিছু ডিএসএলআর এ 4K/Ultra HD ভিডিও রেকর্ড করার সুবিধা দেয়া হলেও মিডরেইঞ্জে থেকে শুরু করে হাই-এন্ড পর্যন্ত সবধরণের মিররলেস ক্যামেরাতেই 4K/Ultra HD কোয়ালিটির ভিডিও রেকর্ড করার সুবিধা পাওয়া যায়। বাজেটে ভালো রেজ্যুলেশনের ভিডিও শ্যুট করতে চান যারা তাদের জন্য মিররলেস সেরা অপশন।
তবুও প্রফেশনালরা যদি ভিডিও রেকর্ড করার জন্য স্টিল ক্যামেরাই কিনলে ডিএসএলআরই কিনে থাকেন। কারণ, অনেক বেশি অপশন পাওয়া যাচ্ছে তখন লেন্স বাছাই করার ক্ষেত্রে। আর তারা অটোফোকাস নিয়ে খুব বেশি ভাবেন না কারণ তারা আগেই সিন রেডি করে সেই অনুযায়ী সাবজেক্ট ফোকাস করে রাখেন।
ব্যাটারিঃ বেশিরভাগ ডিএসএলআর একবারের চার্জে একটা ব্যাটারি প্যাকে কমপক্ষে ৬০০-৬৫০ শটের নিশ্চয়তা দিয়ে থাকে। আর প্রোফেশনাল গ্রেডের বডিগুলোয় কখনো সংখ্যাটা হাজার ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু এন্ট্রি লেভেলের মিররলেস ক্যামেরায় মাত্র ৩০০-৪৫০ শটের বেশি নেয়া যায়না। এমনকি প্রো-গ্রেডের মিররলেস ক্যামেরাও এর চেয়ে খুব বেশি ব্যাটারি লাইফ দিতে পারছেনা। এর কারণ হচ্ছে মিররলেস এর সমস্ত কাজকর্ম অতিমাত্রায় ইলেকট্রনিক্স নির্ভর।
মিররলেস এর এলসিডি স্ক্রিন সাধারণত সবসময় অন থাকে। আর যখন তা বন্ধ থাকে ইভিএফ বা ইলেকট্রনিক ভিউফাইন্ডার ঠিকই চলতে থাকে। এর চেয়ে বেশি ব্যাটারি কে খরচ করতে পারে বলেন। ওভিএফ দেয়া ডিএসএলআর একই কাজে নামমাত্র পরিমাণ ব্যাটারি ব্যাবহার করে। আর মিররলেস ম্যানুফ্যাকচারাররা ক্যামেরা বডিকে হালকা রাখার জন্য ছোট করে বানায় ফলে ব্যাটারির জন্য জায়গাও কম থাকে আর তাই ব্যাটারির আকার ছোট রাখতে হয়।
অনেক মিররলেস ক্যামেরা সেলফোনের মত ইউএসবি পোর্টের মাধ্যমে চার্জ নেয়ার সুবিধা দিয়ে বানানো হয় যা আসলেই বেশ ভালো সুবিধাজনক, বিশেষকরে ট্রাভেলিং এর সময়। এছাড়া অনেক ক্যামেরার বডিতেই ইমেজ স্ট্যাবিলাইজেশন সুবিধা দেয়া থাকে যা সব ধরণের ক্যামেরার ব্যাটারি লাইফেই কিছুটা প্রভাব ফেলে।
আমি কাউকেই সেরা বা কাউকেই খারাপ বলছিনা। সেই ক্যামেরাটাই সেরা যেটা আপনার হাতে আছে তাই নিজের প্রয়োজন আর বাজেট অনুযায়ী বুঝেশুনে ক্যামেরা কিনুন। কারণ গিয়ারের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নিজের জ্ঞান। গিয়ারের পেছনে সমস্ত সময় আর টাকা খরচ না করে ফটোগ্রাফি নিয়ে ভালো একটি বই কিনুন। বিভিন্ন রকম ছবি তুলে এক্সপেরিমেন্ট করুন। আলোছায়া নিয়ে খেলার সমস্ত কায়দাকানুন জানা থাকলে কোন কামেরা ব্যবহার করছেন তা মূখ্য বিষয় না। তখন আপনার জ্ঞান আর অভিজ্ঞতাই আপনাকে সেরা ফলাফলটা দিবে। হ্যাপি ফটোগ্রাফি।

0 Comments